Friday, February 27, 2009

কতিপয় বি.ডি.আর জওয়ানের ম্যাসাকার এবং…

২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে ইটালিয়ান এক ডেলিগেটসের সঙ্গে কাজ করার সময় পরিচিত একজন ফোন করে বলল, খবর শুনছেন বি.ডি.আর আর আর্মির মধ্যেতো যুদ্ধ শুরু হইছে………আর্মি হেলিকাপ্টার দিয়ে আক্রমন করেছে বি.ডি.আর সদরদপ্তর…. ঢাকায় কার্ফিও দিছে প্রভৃতি……খবরটি প্রথমেই আমার বিশ্বাস হয়নি….কারন হঠাৎ করে যুদ্ধ লাগার মত কোন কারন পাচ্ছিলাম না……টিভির কাছ থেকেও দূরে ছিলাম তাই সত্যতা নিশ্চিত করতে পারছিলাম না….যত সময় যেতে লাগল তত বিভিন্ন তথ্য আসছিল….কেউ বলছিল দরবার হলে অফিসারদের একজন জওয়ানকে গুলি করে মারার পর থেকে বিদ্রোহ শুরু হয়…..গুজবের ডালপালা গজাচ্ছিল….খুবই দুশ্চিন্তা হচ্ছিল…আমার টেনশন দেখে ইটালিয়ান ডেলিগেট জানতে চাইল কি হয়েছে? এর মধ্যে ইটালিয়ান এম্বাসি থেকে তাকে ফোন করে বি.ডি.আর সদর দপ্তর পিলখানায় ঘটে যাওয়া ঘটনা জানাল এবং ঐ এলাকা এড়িয়ে চলতে বলল……সে ফোন রেখে দিয়ে বলল এটা কি করে সম্ভব ডিসিপ্লিনড একটি বাহিনি কিভাবে নিজেদের অফিসারদেরকে মেরে ফেলে!!!! বলল….ইটস এ শেইম!!!

সারাটা দিন কেটেছে অস্থিরতায়….রাতে একফোটা ঘুমাতে পারিনি….সেনাবাহিনির আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধবের তথ্য এবং টিভি চ্যানালগুলো ছিল মূল ভরসা খবর জানার জন্য…খবর দেখানোর পাশাপাশি তাদের নিয়মিত নাচ, গানের প্রোগ্রাম দেখাচ্ছিল সেজন্য কিছুক্ষন পর পর একটার পর একটা চ্যানেল চেইন্জ করে আপডেট নিউজ দেখছিলাম…পাশাপাশি মেজাজ খারাপ হচ্ছিল এ ধরনের জাতীয় দুর্যোগের সময় নাচ গানের প্রোগ্রাম চালায় কোন সেন্সে…

কেন এই পাশবিকতা?…ক্ষোভের এই বিস্ফোরন কেন হল? অনেক ক্ষোভ, প্রশ্ন, হতাশা, ঘৃনা, আশঙ্কা, আশা নিয়ে সময় গুলো কাটছিল…কেন আগে থেকে বি.ডি.আর অফিসার এবং গোয়েন্দারা ঘটনা আঁচ করতে পারেননি…যদি বিদ্রোহটি পরিকল্পিত ঘটনাই হয় তবে তো বিষয়টি অনুধাবন করার কথা….এ সব ভাবনার পাশাপাশি বিদ্রোহী জওয়ানদের উপর প্রচন্ড ঘৃনা হচ্ছিল…ভেবেই পাচ্ছিলামনা একটি পেশাদার সৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তাদের নিজেদের নিরস্ত্র অফিসারদের কিভাবে খুন করতে পারে…কিভাবে পারল পথচারীদের উপর গুলি করতে…নিশ্চুই তাদের মনে অনেক ক্ষোভ বা হতাশা ছিল কিন্তু তাই বলে খুন করতে হবে…তারা তো শান্তিপুর্ণ উপায়ে দাবী জানাতে পারত…..শান্তিপূর্ন ভাবে না পারলে অন্তত পক্ষে অফিসারদের বন্দি করে দাবী জানাতে পারত…তাই বলে খুন করতে হবে….

আশাঙ্কা হচ্ছিল সামরিক বাহিনি হঠাৎ করে চেইন অফ কমান্ড ভেঙ্গে প্রতিশোধের জন্য আক্রমন করে কিনা…..তবে সামরিক বাহীনি নির্দেশিত ছিল যেন জওয়ানরা বাইরে আসতে না পারে সে জন্য তারা পুরো পিলখানা ঘিরে রেখেছিল…সামরিক বাহিনির ডিফেন্সিভ পজিশন আস্বস্থ্য করছিল তবে তারা প্রস্তুত ছিল যেকোন নির্দেশ পালনের জন্য…..সরকারের মন্ত্রী, এম.পি-দের সাহসী ও কৌশলী ভুমিকা ক্ষনে ক্ষনে আশা জাগাচ্ছিল….মনে হচ্ছিল এখনই শান্তিপূর্ন সমাধান বেড় হয়ে আসবে…আবার জওয়ানদের এলোমেলো আক্রমনাত্মক আচরন নতুন নতুন আশাঙ্কার জন্ম দিচ্ছিল….শেষ পর্যন্ত প্রধান মন্ত্রীর ভাষনটি ছিল এক কথায় অসাধারণ এবং কার্যকরী….যার ফলে শ্বাসরুদ্ধকর ৩৩ ঘন্টার একটি কলংকিত অধ্যায়ের শান্তিপূর্ন সমাধান হয়….

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরব কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী তাদের অভ্যন্তরিন বিশৃঙ্খলা, জাতীয় নেতাদের হত্যা এবং রাজনীতিতে হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নিজেদের মর্যাদা খুইয়েছে….১/১১ ঘটনার কারনে বর্তমানে প্রায় সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ সেনাবাহিনি বিরোধি মনোভাব তুঙ্গে; সংসদে, টক-শোতে, জনসভা সমূহে নিয়মিত তা প্রকাশ পাচ্ছে….এবং বর্তমানে সাধারণ মানুষও যে সেনাবাহিনির উপর বিরক্ত তা এই দু’দিন প্রকাশ পেয়েছে…বি.ডি.আরে’র উছৃঙ্খল জওয়ানরা বিদ্রোহের নামে শতাধিক মেধাবী অফিসারদের খুন, লুটতরাজ, ধর্ষন করার পরও জনগনের মধ্যে বি.ডি.আর সহানূভূতি কাজ করছে…টিভি মিডিয়াও প্রথম দুদিন এই অনুভুতিটাকে প্রমোট করেছে….বি.ডি.আর জওয়ান বিদ্রোহ সেনাবাহিনির মনোবল অনেকাংশে নষ্ট করেছে…এখন সরকারকে জরুরী ভিত্তিতে এই বিষয়টির দিকে নজর দিতে হবে….সেনাবাহিনিকে সাধুবাদ জানাতে চাই গত দুদিনে চোখের সামনে শতাধিক সহকর্মীদের খুন হতে দেখার পরও তারা সরকারের কমান্ড ফলো করেছে এবং শান্তিপূর্ন আচরন করেছে….

এই শান্তিপূর্ন সমাধানের জন্য আওয়ামীলিগ সরকারকে অভিনন্দন এবং ধন্যবাদ…..তবে সমস্যার মাত্র একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হয়েছে….এবং অনেক প্রশ্ন তৈরী করেছে…..এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে জরুরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে….এবং বি.ডি.আর এর চেইন অফ কমান্ড ফিরিয়ে আনতে হবে…..এ ধরনের ঘটনা আমরা আর দেখতে চাইনা……

No comments: