Thursday, February 12, 2009

ভালবাসা দিবসে ভাল বাসা খোজা

প্রীয় মেম সাহেব,

“ভালবাসা মোরে ভিখারী করেছে, তোমারে করেছে রানী”…ছোট বেলায় বহুবার শোনা গানটি যতবার শুনেছি ততবার ব্যাখ্যা করেছি এরকম যে, নিশ্চুই বেচারা দামি বাসায় ভাড়া থাকত, বাড়ির মালিক ছিল মহিলা…ভাল বাসার জন্য বেশী ভাড়া দিতে দিতে বেচারা গরীব হয়েছে আর বাড়িওয়ালি সেই টাকায় রানীর মত সম্পদশালী হয়েছে…ভালবাসা নামক বস্তুটি আমার কাছে বরাবর অদ্ভুত মনে হত…নাটক, সিনামা, গল্প, কবিতায় যা বলা হয় তাহা নিছক অতিরঞ্জিত মনে হত…ভালবাসা মানেই পিটুইটারি গ্লান্ডের রাসায়নিক ক্রিয়া-বিক্রিয়া…ফলে ভালবাসা সব সময় আমার কাছ থেকে শত হাত দূরেই ছিল…আজ ইতি তো কাল রিমি, সুমি, কাকলী, বীনা, ব্রিজিট, জুলিয়া, কাওরী, উর্মিদের নিয়ে ব্যস্ত জীবনই কাটছিল…ভাল বাসার সন্ধানে দেশী-বিদেশি ফুলের সৌরভ নিচ্ছিলাম আর সুখ পাখীর ডানায় ভর করে এন্যাটমি ফিজিওলজিক্যাল জ্ঞান আহরন করছিলাম……….

তখনই হঠাৎকরেই তোমার সঙ্গে পরিচয়…তুমি সদ্য যোগ দেয়া একজন, চেষ্টা করছ ক্যারিয়ার ডেভেলপের জন্য…তুমি অন্য ডিপার্টমেন্টে ছিলে প্রতিদিনই দ্যাখা হওয়া, হাই-হ্যালো পর্যন্ত আমাদের পরিচয় সিমাবদ্ধ ছিল…তখন আমি জাপানীজ বান্ধবী কাওরীর সাকি স্বাদ গ্রহণে ব্যস্ত ছিলাম…মাঝে মাঝে ক্যান্টিনে অন্য কলিগদের সঙ্গে তোমাকে দেখতাম…একদিন তুমি বললে “আচ্ছা আমাকে কম্পিউটারের কিছু ট্যাকনিকাল ধারনা দিবেন, আমি না বাংলা টাইপ করতে পারিনা”…এরপর নিয়মিত আমার কম্পিউটারে তোমার হাতের বিচরন…একদিন তুমি আমার কম্পিউটারে সংরক্ষিত সব সিক্রেট কালেকশন দেখে ফেললে কি যে বিব্রতকর অবস্থা…তবুও কিছু হয়নি এমন ভাব নিয়ে থাকলে…যেহেতু পাশাপাশি কোয়ার্টারে ছিলাম তুমি নিয়মিত আমার রুমে আড্ডা দিতে আসতে…আমি তখন রক-মেটাল গান নিয়ে উচ্ছাসিত, তুমি একদিন গিফট করলে শ্রীকান্ত আচার্য্যের গানের সিডি…গান গুলো প্রথমদিকে শ্লো মনে হলেও ভাল লাগল…একদিন গিফ্ট করলে শেষের কবিতার অডিও সিডি…কথপকথন ধাঁচের অডিও আগে শুনিনি দারুন লাগল…তুমি আমার ঘরের রকিং ইন্টিরিয়র ডিজাইন চেইঞ্জ করে রোমান্টিক টাচ দিলে…বই মেলা থেকে শরৎ চন্দ্রের চরিত্রহিন উপন্যাসটি কিনে দিলে…বইয়ের নামটি বিব্রত করলেও বইটির কঠিন ভাষার কারনে পড়তে গিয়ে দাঁত ভেঙ্গে যাবার উপক্রম হয়েছিল…তবুও তোমার শর্ত ছিল, সেহেতু ৩/৪ রাত জেগে ৩/৪বার পড়ার পর উপন্যাসের মর্মার্থ বেড় করতে পেরেছিলাম…তোমার রান্নার হাত দারুন ছিল, মাঝে মাঝে পাস্তা, স্পেগেট্টিও রেধেঁ খাওয়াতে…আমার হলিউডের একশ্যান ছবি পছন্দ ছিল…হিন্দি বিশেষ করে রোমান্টিক ছবি দুচোখে দেখতে পারতাম না…তুমি মাঝে মাঝে হিন্দি মুভি নিয়ে আসতে আমার পিসিতে দেখার জন্য…প্রথম প্রথম আমি দেখতে চাইতাম না; হাসা হাসি করতাম, তুমি আমাকে সংলাপগুলো বুঝেয়ে বলতে……….অপরিচিতা তুমি, কখন যে খুব পরিচিত হলে বুঝতেই পারিনি….পরিবর্তিত আমি কখন সম্পুর্নভাবে তোমার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লাম তা জানতেই দাওনি…কখন আমরা আপনি থেকে তুমি/তুই তে এসেছি তাও টের পাইনি…তুমি আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলে সে জন্য অথবা মজা করার জন্য মাঝে মাঝে আমাকে তুই সংবোধন করতে…মাঝে মাঝে কপট রাগ করতাম…তখন তুমি আরো উদ্দ্যমে আমাকে আচরে দিতে কামরে দিতে…মাঝে মাঝে বিছানা ঝারুটাও প্রয়োগ করতে….আমার তাল, লয়, সুরহিন গান শুনে বলতে কি! “কবিতা পাঠ করছ”……….

তুমি যে, আমার প্রজাপতিদের তুলনায় খুব সুন্দরী ছিলে তা বলবনা…কিন্তু তোমার বাদামী ত্বক, তোমার চোখ, তোমার লাজুক কিন্তু আত্ম-সম্মান বোধ ব্যাক্তিত্ব আমাকে মুগ্ধ করত…তুমি যখন শারী পরতে তখন তোমাকে অপূর্ব লাগত…আমি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতাম আর তুমি বলতে “মুখ বন্ধ কর, মুখে মশা ঢুকবে”…অন্য রকম একটা আবেশে তোমার সঙ্গে সময়গুলো কাটছিল……….

তুমি বাসার মেঝ মেয়ে, দ্বায়িত্বশিল মেয়ে…পরিবার অন্ত:প্রাণ ছিলে…যেহেতু পরিবারের অনেকেই ইটালিতে থাকে তাই ইটালিতে যাওয়া আসা ছিল…তবে হঠাৎ যেদিন অশ্রু সজল চোখে বললে “শোন আমি ইটালি চলে যাচ্ছি”…আমার এখনো মনে আছে আমার হৃদয়টা কেঁপে উঠেছিল, কিছু সময় নির্বাক হয়েছিলাম…তুমি আমার বুকে মাথা রেখে অঝরো ধারায় সেদিন কেঁদে ছিলে…আমার পৃথিবিটা কেমন উলট পালট হয়ে গিয়েছিল…তুমি বুকে মাথা রেখে বলেছিলে ফিরবে আমার কাছে…ভেঙ্গে পড়ার ভয়ে বিদায় বেলায় ইচ্ছে করে ছিলাম না……….

তুমি ইটালিতে যাওয়ার পর আমাদের নিয়মিত ই-মেইল ও ফোন যোগাযোগ হত কিন্তু আস্তে আস্তে আমাদের!!! ব্যস্ততার কারনে সেটাও কমতে থাকল…অনেকদিন পর একদিন তুমি ফোন করে বললে, দেখ জীবনটা শুধু ছুটে বেড়ানোর জন্য না, জীবনে কিছুটা স্থিরতা প্রয়োজন…মানুষের জীবনে বিয়ে প্রয়োজন…বিভিন্ন বিষয়ে অনেক্ষন এলোমেলো কথা বলে এক সময় বাস্পরুদ্ধ কন্ঠে বললে “শোন আমার কিন্তু বিয়ে হয়ে গ্যাছে, আমায় ক্ষমা কর”…তারপর কি বলেছিল আমার মনে নেই, হয়তবা সান্তনা, অনুপ্রেরণা, কিছু একটা…আমি তখন কিছুই শুনছিলাম না শুধু তোমার কথাটা কানে বাজছিল “শোন আমার কিন্তু বিয়ে হয়ে গ্যাছে”…তারপর একদিন, বহুদিন পর ফোন করে জানতে চাইলে আমি কেমন আছি? তোমাকে ঘৃনা করছি কিনা? আমি তখন হাসলাম, অনেক্ষণ ধরে, অনেকদিন পর হাসলাম…তুমি বলেছিলে ভালবাসা কেন এমন হয়? ভালবাসা কেন হারিয়ে যায়…সে দিন তোমার নতুন সংসার, নতুন জীবন নিয়ে অনেক গল্প হলো…তুমি বলেছিলে তুমি অনেক সুখে আছ!!!…আমাকেও পরামর্শ দিলে বিয়ে করার জন্য…বললে, আমার জন্য চমৎকার মেয়েও দেখেছ…এ সব কথা বলে হয়তবা তুমি নিজেকে স্বান্তনা দিতে চেয়েছ অথবা নিজের অপরাধবোধ ঢাকতে চেয়েছ, নয়ত ভাবছ যে তোমাকে আমি অভিশম্পাত করছি……….

না তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছিনা বা অপরাধিও ভাবছিনা…দুরন্ত, গতিশিল, ছন্নছাড়া সেই আমি এই আমিতে রুপান্তর যে তোমার ছোঁয়ায়…তোমার মায়াবি স্পর্শ আমাকে চরম থেকে পরম করেছে…তোমার মোহনিয় যাদুতে ভাল বাসা কে ভালবাসা জেনেছি…হয়তবা দেবদাসের মত খোচা খোচা দাড়ি রেখে বিবাগী হইনি…অথবা কোন রুপকথার নায়কের মত দ্বীপান্তরি হইনি; প্রেমাহত হয়ে গাইনি “নিস্ব: করেছ আমায়, কি নিঠুর ছলনায়”…তাই বলে ভেবনা তোমায় কম ভালবেসেছি…আমার কালো মেম; তোমায় আমি ভীষন ভালবাসি…ভালবাসায় যে জিততে হবে বা পেতেই হবে, তেমনতো মনে আসেনি………….

জানিনা অর্ন্তজালে তোমার বিচরন আছে কি নেই, তুমি আমার ব্লগ পড় কি পড়না তাও জানিনা, তবু আজ ফাল্গুনের শুরুতে ভালবাসা দিবসে আমার এই চিঠিখানি ও আমাদের প্রীয় গানটি তোমার প্রতি নৈবদ্য হিসেবে দিলাম..আমার নৈবদ্য তোমার চোখে পরুক আর না পরুক, শুধু কামনা করি; যে খানেই থাক, যেভাবেই থাক, থাক যত দূর; তোমার প্রতিটি ভোর যেন হয় আলোকিত…প্রতিটি দিন যেন হয় ভালবাসাময়…প্রতিটি সন্ধ্যা যেন আসে সুখের বারতা নিয়ে…প্রতিটি রাত যেন নামে প্রশান্তিতে…তোমার ঝলমলে হাসি যেন ছড়িয়ে পরে ইথারে ইথারে…ভাল থাক তুমি; সকাল-বিকাল-সন্ধ্যা, ভালবাসা দিবসে শুধু এই কামনা…………….

প্রিতিময় শুভেচ্ছায়,

তোমারই আমি

Get this widget | Track details | eSnips Social DNA

No comments: