আজ দুপুরে এন.এইচ.কে রেডিওর তানিয়া নাজনীনের চিঠি পেলাম….সাকুরা বা চেরি ফুলের উপর দু’পাতার চমৎকার একটি চিঠি পাঠিয়েছেন….গত অক্টোবরে যখন জাপানে গিয়েছিলাম তখন প্রায় সামারের শেষ ছিল তাই সাকুরা/চেরি ফুল দেখার সৌভাগ্য হয়নি….তাই ভাবলাম যে, ব্লগার বন্ধুগণকে সঙ্গে নিয়ে চিঠিটি পড়ি এবং সাকুরা’কে জানি
“আগে কখনো দেখিনি, শুধু অনেক গল্প শুনেছিলাম। সেটা হচ্ছে জাপানের মোহিনী পুষ্পরানী সাকুরা, আমরা যাকে চেরি বোলে জানি। বাংলাদেশে চেরি বোলে একটি ফুলকে আমি চিনতাম, কল্পনায় ধরে নিয়েছিলাম তারই মত কিংবা তার চেয়ে আরও সুন্দর ফুল হয়তো হবে জাপানের চেরি বা সাকুরা। কিন্তু বাস্তবে সাকুরার অনিন্দ্য সৌন্দর্য্য দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।
সত্যি, পুষ্প সৌন্দর্য্য যে এত মোহনীয় হতে পারে অথবা জাগিয়ে তুলতে পারে মানব জীবনের গভীর দর্শনকে; তা শুধু পরিপূর্ন ভাবে প্রস্ফুটিত চেরি গাছের ছায়াতলেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
বছর খানেক আগে আমি যখন জাপানে এলাম, তার আগেই চেরি গাছ গুলো শ্রীহীন রিক্ত অর্থাৎ ন্যাড়া রুপ ধারন করে। জাপানে এ বছর শীতের তীব্রতা মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলেছে। এরপর কয়েকদিন কিছুটা গরম পড়তেই রুক্ষ চেরি গাছ গুলোর ডাল-পালা কান্ড ভেদ কোরে দৃষ্টিগোচর হয় কুঁড়ি। আর সঙ্গে সঙ্গে সারা জাপানে যেন বসন্ত বরনের সাজ সাজ রব পড়ে যায়। জাপানের আবাহাওয়া দপ্তর চেরি ফোঁটার সম্ভাব্য দিন ক্ষন নিয়ে গবেষনা করতে শুরু করে। তবে মজার ব্যাপার মার্চের শেষে আবার শীতের প্রকোপ বেশী হলে অঙ্কুরিত কুঁড়িগুলো পাঁপড়ি মেলে না ধরে সেই মুদিত আবস্থাতেই রয়ে যায় কিছুদিন। অবশেষে এক বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে চেরি তার পূর্নরুপে বিকশিত হয়।
বিচ্ছিন্নভাবে একটি চেরি ফুল নজর কাড়ার মত সুন্দর নয়, তবে পত্রহীন বৃক্ষের সর্বগাত্র ভেদ কোরে প্রস্ফুটিত রাশি রাশি চেরি এক সঙ্গে দেখলে তা আসলেই এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারনা করে। গঠন, আকৃতি, রঙ-রুপের বৈচিত্র্যের দিক থেকে সাদা, হালকা গোলাপী আভাযুক্ত সাদা, হালকা গোলাপী, গাঢ় গোলাপী, এগুলোই সাধারনত বেশী দেখা যায়। তবে জাপানীরা তাদের অসাধারণ উদ্ভাবনী ক্ষমতাবলে কৃত্রিমভাবে সবুজ চেরিও সৃষ্টি করেছে। বনে-জঙ্গলে ফোঁটা চেরিকে মনের মাধুরী মেশানো রঙ-রুপে সৃষ্টি করা হয়েছে, আর দলবদ্ধ ও পূর্ণ প্রস্ফুটিত চেরির সৌন্দর্য্য নয়নভরে উপভোগ করার জন্য বিভিন্ন স্থানে চেরির বাগান গড়ে তোলা হয়েছে। চেরি গাছগুলো শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে দিয়ে বেশ বড় হয়। ছড়িয়ে দেয়া সৌন্দর্য্য যেহেতু মানবকুলের উপভোগের জন্যই, তাই এর বিস্তৃতি উচ্চতার তুলনায় চর্তুদিকেই বেশী। জাপানীরা চেরির এই সৌন্দর্য্য উপভোগের জন্য চেরি গাছের নীচে সারাদিন অবস্থান করেন, পছন্দের আহার পানীয় গ্রহনের পাশাপাশি তারা চেরির অপরুপ শোভা অবলোকন করেন যাকে বলা হয় হানামী উৎসব। মন-প্রাণ ভরে এই সৌন্দর্য্য উপভোগের আরো একটি কারন চেরির ক্ষনস্থায়ী জীবন। পূর্ন প্রস্ফুটিত হওয়ার তিন-চার দিনের মধ্যেই ঝরে পড়তে শুরু করে। চেরির পাঁপড়ি গুলো যা মানবজীবনের ক্ষনস্থায়ীত্বেরই প্রতীক। মানব জীবন ক্ষনস্থায়ী, কিংবা সুন্দর থাকতে থাকতেই ঝরে পড়া অথবা ক্ষনস্থায়ী মানবজীবনে সব সময় সুন্দর থাকার চেষ্টা করা, এই দার্শনও জাপানীরা নাকি চেরির কাছ থেকেই পেয়েছেন। জাপানের সাহিত্য কর্মে প্রানবন্ত জীবনের প্রতীক রুপে চেরিকে তুলে ধরা হয়।
এপ্রিল মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তী পরীক্ষায় উত্তির্ন হলে, প্রার্থীকে পাঠানো চিঠিতে লেখা থাকে সাকুরা ফুল ফুটে গেছে। চেরি ফোঁটার এই স্বল্পস্থায়ী সময়ের মধ্যে আমি টোকিওর মধ্যে কয়েকটি স্থানে চেরির সৌন্দর্য্য দর্শনে গিয়েছিলাম। টোকিও প্রযুক্তি ইন্সিটিউট ক্যাম্পাসে চেরি গাছের তলে আশীতিপর বৃদ্ধ দম্পতির বিপুল উৎসাহে ছবি তোলার দৃশ্য সত্যি অভাবনীয়্। চেরির ছড়িয়ে দেয়া রুপ-শোভা এবং তা মন-প্রাণ-নয়ন ভরে উপভোগ করার সেই পরিবেশ দেখে আমি সত্যি বিস্মিত, আভিভূত হয়েছি। শীতের শেষে প্রকৃতির উষ্ঞ পরশে, বসন্তের মৃদুমন্দ হিল্লোলে, প্রস্ফুটিত পুষ্পতরুর ছায়াতলে ভীড় জমিয়েছেন হাজারো সৌন্দর্য্য পিপাসু। পছন্দের আহার-পানীয় সহকারে অর্থনিশি যাপন করছেন সেই বৃক্ষরাজির আলিঙ্গন ছায়ায়। প্রায় ভূমি স্পর্শ করা রাশি রাশি পুষ্প সমৃদ্ধ শাখা-প্রশাখার অন্তরাল গলিয়ে, মধ্য গগনের নীল আকাশ থেকে ঝরে পড়া কিরনছঁটা, গভীর দিবা নিদ্রায় মগ্ন মানব-মানবীর দেহ আবয়বে অপূর্ব সৌন্দর্য্যের অবতারনা করেছিল।
চেরির এই অসাধারণ সৌন্দর্য্য আমাকে একরকম আচ্ছন্ন কোরেই রেখিছিল। এদো যুগে অর্থাৎ ৩শ বছর আগে টোকিও শহর নতুন কোরে নির্মানের সময় সুপরিকল্পিতভাবে লাগানো হয়েছিল অসংখ্য চেরি গাছ, গড়ে তোলা হয়েছিল চেরি উদ্যান। অতি যত্ন কোরে লাগানো গাছ গুলো প্রতি বসন্তে শোভা ছড়িয়ে প্রতিদান দিয়ে চলছে। নদীর কিনার ঘেষে রোপিত চেরি গাছ গুলোর পুষ্প শোভিত শাখা প্রশাখা প্রবাহমান জলের মধ্যে তৈরী করছে প্রতিবিম্ব। আজকের এই আধুনিক উন্নত ধন্যাঢ্য জাপান তো ৩শ বছর আগে ছিলনা কিন্তু সুন্দরের প্রতি ভালবাসা, সুন্দরকে লালন করা, নিজের সত্তার মধ্যে ধারন করা এই বোধটুকু তখনও ছিল, আর এটাই জাপানীদের সহজাত বৈশিষ্ট্য বোলে মনে হয়।
চেরির এই শোভা দেখার পর থেকে আমার, বাংলার বর্নিল কৃষ্ঞচূড়া-রাধাচূড়া, জারুলের সৌন্দর্য্যের কথা বারবারই মনে পড়েছে। সেও তো কোনো অংশে কম কিছু নয়, কিন্তু পরিকল্পিতভাবে সেই সুন্দরের মর্যাদা, তাকে লালন কিংবা রক্ষনা বেক্ষন, অথবা মন-প্রাণ ভরে উপভোগ, সেই দর্শনতো আমাদের নেই। ঘ্রান ইন্দ্রিয় সজাগ রেখে অনুভব করেছি চেরি ফুলে কোন সুরভী নেই। শুধু চেরি নয়, জাপানের আরও অনেক সুদৃশ্য ফুলেও কোনো সুগন্ধ নেই। এই বিষয়টা ভাবলেই আমার মনে পড়েছে বাংলার রজনীগন্ধা, গন্ধরাজ, হাসনাহেনা, জুঁই-চামেলী-বেলী, শরতের শিউলি, বকুল, বর্ষার কদমের পাগলকরা ঘ্রান এবং সৌন্দর্য্যের রানী বোলে কথিত গোলাপের মিষ্টি সুবাসের কথা।
যাই হোক, ফিরে আসি আবারও চেরি প্রসঙ্গে। ক্ষনস্থায়ী জীবনের শেষের দিনগুলোকে বসন্তের মৃদুমন্দ হাওয়ার সঙ্গে ঝরে পড়তে দেখেছি চেরির পাঁপড়িগুলাকে। ঠিক যেন তুষার পড়ার মত ঝরে পড়ার এই বেদনাকে প্রশমিত করতেই হয়তবা ততদিনে উঁকি দিতে শুরু করেছে রক্তিম আভাযুক্ত সবুজ কিশলয়। সূর্যালোকে প্রখর হয়ে উঠার সঙ্গে সঙ্গে গাঢ় সবুজ পত্ররাজিতে ঢেকে যাবে শীতে রিক্ত হওয়া এই গাছ গুলো। তারপর হেমন্তে, আবার আসবে পাতা ঝরার দিন, যা হয়তো বা আগামী বসন্তে আপরুপ-অসীম সৌন্দর্য্য শোভিত ছায়াতলে বিধাতার সেরা সৃষ্টিকুলকে সাড়ম্বরে আবাহনের ক্ষনিক নীরব প্রস্তুতি। সেই শুভ লগ্নের প্রতীক্ষার ক্ষন গননা চলবে বছর জুড়ে।
তানিয়া নাজনীন
এপ্রীল ২০০৯, টোকিও।
No comments:
Post a Comment