বাঙ্গালি হইয়া জন্মানোর ইহা এক জ্বালা…অল্পতেই সব কিছুর প্রতি প্রগাঢ মায়া তৈরী হয়…এয়ারপোর্টের যত কাছা কাছি পৌছাছি তত মায়া বাড়ছে হোটেলের হাসিমুখে রিসিপশনে দাড়িয়ে থাকা মেয়েটির জন্য…মায়া হচ্ছে খুব বিনয়ের সঙ্গে রুম সার্ভিস প্রদান করা ছেলেটির জন্য…মায়া হচ্ছে রাতের বেলায় উদভ্রান্ত আমায় কটেজে ফেরার পথ দেখিয়ে দেয়া নাইট গার্ডটির জন্য…আমরা অতি আবেগী জাতী অল্পতেই প্রত্যাশার বলয় তৈরী করি আবার খুব দ্রুত আশাহত হই………..
আহা!! কয়েকদিনের রিলাক্সিং সময়টি কত দ্রুত কেটে গেল…আবার নামতে হবে জীবন যুদ্ধে!!!…এয়ারপোর্টে পৌছে দ্রুত চেক-ইন করেই, ডিউটি ফ্রী শপে ঢু দিলাম….ফ্রী শব্দটা শুনলেই একটা চার্ম জাগে কিন্তু ডিউটি ফ্রী শপ বাশ খাবার একটা ভাল জায়গাও বটে…প্রথমেই ডিস্টিলার শপে ঢু দিলাম, দুষ্ট বন্ধুদের সূরার তৃষ্ঞা নিবারনের দায়িত্ব মাথায় নিয়ে শপে ঢুকার পূর্বে অবশিষ্ট বাথ সমূহ হিসেব করে দেখলাম; এ বাজেটে লন্ডন ড্রাই জিনে কাভার হবেনা তাই ফিনল্যান্ডের চমৎকার মোরকের ভদকা এবং ট্রিপল ফাইভের কার্টনটি প্যাকেটজাত করেই ওয়েটিং লাউঞ্জে পৌছুলাম…সাধারণত ঢাকা টু ব্যাংকক ফ্লাইট দেশী-বিদেশী যাত্রীর মধ্যে সংখ্যার একটি ব্যালেন্স থাকে তবে আজকে বিদেশ ফেরত দেশী যাত্রীতে লাউঞ্জ পূর্ণ…হঠাৎ করে মনে হতে পারে ইহা বাংলাদেশের কোন বাস স্ট্যান্ড…বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষায় যাত্রীদের মধ্যে তুমুল গল্প…কিছুক্ষন পর নাদুস নুদুস স্বাস্থ্যবতি নারী ইমিগ্রেশন অফিসার পর্যবেক্ষনে আসল, হঠাৎ করে লাউঞ্জে পিন পতন নিরাবতা নামল; মনে হলো আমি সেই ছোট বেলার কোন ক্লাস রুমে হঠাৎ করে টিচার পৌছুলে যেমন ক্লাস রুমে নিরাবতা নামত…বেচারির পর্যবেক্ষন বেশীক্ষন চলেনি, শত শত হা করা স্ক্যানিং দৃষ্টির সামনে থেকে সরে পরে বাচল…হাতে প্রায় ৪৫মি: আছে তাই ভাবলাম আলাপ জুড়ে দেই; গল্প করতে থাকা একটি জটলার কাছে গিয়ে বললাম;
ভাইয়েরা কেমন আছেন? কোন খান থেইকা ফিরলেন? হয়ত একটু দূরে দাড়িয়ে থাকার কারনে আমাকে ইন্ডিয়ান মনে করেছিল কিন্তু বাংলা শুনে প্রত্যেকের মুখে খৈ ফুটতে শুরু করল এবং আরো বড় জটলার সৃষ্টি হল…
হাউ কাউয়ের মধ্যে যতটুকু বুঝলাম বর্তমান চলমান বিশ্ব মন্দার কারনে মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর ও মালয়শিয়া থেকে তারা ফিরছে….কিছুক্ষন কথা বলার পর মোটামুটি ভাইস ভার্সা সিচুয়েশন তৈরী হল…আমি প্রশ্নকারির ভূমিকা নিলাম তারা সাক্ষাতকার দিচ্ছে তেমন পদ্ধতিতে যা জানলাম; কম্পানি ছাটাই করার কারনে দেশে ফিরে যাচ্ছে, এ ক্ষেত্রে এম্বাসিগুলা কোন সহযোগীতা করছেনা, নিজের জমানো টাকায় ফেরত যেতে হচ্ছে…৩/৪ লাখ টাকা খরচ করে কেউ কেউ মাত্র ৮ মাস হয়েছে গিয়েছে কিন্তু টাকা পাঠানো শুরু করতে না করতেই ফেরত আসতে হল…যে চুক্তি অনুসারে নেয়া হয়েছে তার মাত্র ৪৫/৫০ ভাগ সুবিধা তাদের প্রদান করা হত প্রভৃতি…যা নিয়মিত আমরা পত্রিকার পাতায় পড়ি….
জিজ্ঞেস করলাম; ইন্ডিয়ান শ্রমিকরাও কি ফিরে আসছে? তখন সবাই সমস্বরে বলল ভাই ইন্ডিয়ান শ্রমিকরা আছে আরামে; বিদেশে আসতে আমাদের চেয়ে অনেক কম খরচে আসে, চুক্তির সব সুযোগ সুবিধা পায়, এম্বাসি নিয়মিত খোজ খবর রাখে; সরকার তাদের প্রচুর সাপোর্ট দেয়, নিয়মিত ঐ দেশের সরাকার ও কম্পানির সঙ্গে তাদের এম্বাসিগুলো যোগাযোগ রাখে……
বিক্রোমপুরের ১৮/১৯ বছর বয়সি টগবগে মোস্তাককে জিজ্ঞেস করলাম বাড়িত গিয়া কি করবা; হাসি খুশি মুখটা হঠাৎ ম্লান হয়ে গেল “কি আর করমু আগে বাসের হেল্পারি করতাম, দেহি কামডা আবার পাই নাকি”…..
প্লেনে উঠতে উঠতে ফেরত আসা সবার জন্য হৃদয়টা মুচরে উঠল…বিপুল ধার-দেনা কিভাবে শোধ করবে? বিশাল বেকারত্বের মাঝে আবার কি কোন কাজ দ্রুত পাবে? অনিশ্চিত জীবনের আশঙ্কার দোলাচলে ধিরে ধিরে থাই এয়ারওয়েজের বিমানটি জিয়া আর্ন্তজাতিক বিমান বন্দরে ল্যান্ড করল…………
No comments:
Post a Comment